
পাবনা জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জেলার আয়তন ২,৩৭১ বর্গকিলোমিটার, যা পদ্মা, যমুনা, ইছামতি ও গুমানী নদীবেষ্টিত। নামকরণ নিয়ে দুটি মত প্রচলিত – একদল মনে করেন স্থানীয় ‘পাবনী’ (পদ্মা নদীর স্থানীয় নাম) থেকে নামটি এসেছে, অন্যদিকে সাঁওতালি ভাষায় ‘পাবনা’ শব্দের অর্থ ‘নদীর দেশ’।
ঐতিহাসিকভাবে পাবনা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ এবং ১৮৭৩-৭৫ সালের কৃষক বিদ্রোহ এখানকার মানুষের সংগ্রামী চেতনার স্বাক্ষর বহন করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলা ছিল ৭ নং সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। জেলায় ১৭২ জন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং ৩২টি বধ্যভূমি রয়েছে, যার মধ্যে চাটমোহরে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পাবনার অবকাঠামোগত উন্নয়নে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ একটি মাইলফলক। ১৯১৫ সালে নির্মিত এই ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু বাংলাদেশ-ভারত রেল সংযোগের প্রধান সূত্র। অন্যদিকে ঈশ্বরদী উপজেলায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন) দেশের শক্তি খাতে বিপ্লব আনতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ১০ হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
জেলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি, বিশেষ করে ধান, পাট ও আখ চাষ। এখানকার চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হিসেবে পরিচিত। সাংস্কৃতিক দিক থেকে পাবনা ভাটিয়ালি গান, পালকি গান ও কবিগানের জন্য বিখ্যাত। এডওয়ার্ড কলেজ (১৮৯৮) এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৮) এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। নদীভাঙনে গত ১০ বছরে ৪২ বর্গকিলোমিটার ভূমি বিলীন হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রতি ১০ হাজার জনে মাত্র ৩.২টি হাসপাতাল শয্যা রয়েছে, যা জাতীয় গড় ৪.৫ এর চেয়ে কম। পর্যটন খাতের উন্নয়নে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, চলনবিল এবং জমিদার বাড়িগুলোকে কাজে লাগানোর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতিহাসবিদ ড. আহমদ রফিকের মতে, “পাবনা কেবল একটি জেলা নয়, এটি বাংলাদেশের সংগ্রাম ও উন্নয়নের জীবন্ত দলিল।” জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কিভাবে এই জেলা তার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করবে, তা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।